সূরা হুমাজাহ এর আলোকে। وَيْلٌ لِّـكُلِّ هُمَزَةٍ لُّمَزَةٍ
“দুর্ভোগ এমন প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য যে (সামনাসামনি) মানুষের নিন্দা করে আর (অসাক্ষাতে) দুর্নাম করে,”এই সূরায় প্রথম আয়াত থেকে এর নামকরণ করা হয়েছে। উক্ত সূরার মধ্যে মহান আল্লাহ তায়ালা গীবত বা পরনিন্দা সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। আমরা এই সূরার আলোকে গীবত বা পরনিন্দা সম্পর্কে জানার চেষ্টা করব, ওমা তৌফিক ইল্লা বিল্লাহ।
আসুন আমরা জেনে নেই শাব্দিক অর্থগতভাবে। হুমাজাহ এবং লোমাজাহ দুইটি শব্দ এই দুইটি শব্দ দ্বারা কি বোঝাতে চেয়েছেন, এই দুটা শব্দ অর্থ প্রায় একই। দুটি শব্দ দ্বারা বোঝাতে চেয়েছেন যারা মানুষের পিছনে অর্থাৎ অ সাক্ষাতে বদনাম করে, দুর্নাম করে, সেগুলাকে সাধারণত গীবত বলে যা এই সূরার লুমাজাহ শব্দ দ্বারা বুঝানো হয়েছে। আর একটা বিষয় এখানে উল্লেখ রয়েছে, যে আমরা অনেক সময় বলে থাকি, আমি মানুষের মুখের উপর হক কথা বলি, স্টেট ফরোয়ার্ড কথা বলি, মানুষের সামনে কথা বলে মানুষকে ছোট করে, মানুষের মনে কষ্ট দেয়,এটা অনেক সময় ঠাট্টা বিদ্রুপের মাধ্যমেও করে থাকে ইত্যাদি না না ভাবে মানুষের মনে কষ্ট দিয়ে থাকে, হুমাজা শব্দ দিয়ে আল্লাহতালা এই সূরার মাধ্যমে এই বিষয়টাকে বুঝাতে চেয়েছেন।
আমরা এই পরনিন্দা বা গীবত নিয়ে বিশদভাবে আলোচনা করব।
আমরা জানবো গীবত কিভাবে করি?
হাদিস শরীফ থেকে জানা গেছে যে হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহার উপস্থিতিতে, রাসুল সাঃ এর কাছে একজন মহিলা আসল, হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম এর সাথে কথাবার্তা বলল এবং চলে গেল। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহা বললেন, লোকটি খাটো ছিল । হুজুর সাঃ বললেন আয়েশা তুমি ওই মহিলার গীবত করলা। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহা বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহুআলাই সাল্লাম, মহিলাটি আসলেই খাটো / বেটে ছিল আমিতো শুধু এটুকুই বললাম, এটাতো তার মধ্যে রয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম বললেন এজন্য এটা গীবত। সে যদি খাটো না হতো তুমি যদি বলতা যে, সে খাটো তাহলে এটা তার বিরুদ্ধে অপবাদের হত। তাহলে আমরা জানলাম, যদি কারো মধ্যে কোন দোষ ত্রুটি থাকে তার অনুপস্থিতিতে সেটা অন্যের কাছে বলার নামই গীবত। আর যদি দোষ না থাকে তাহলে সেটা অপবাদের গুনা। আমরা হর হামেসে মানুষের কত গীবত করে থাকি। আর গীবতের গুনার হচ্ছে ভয়াবহ পরিণতি হল নিজের নেক আমল অন্যর আমলনামায় স্থানান্তরিত হওয়া। আল্লাহতালা আমাকে সহ সকলকে কি ভয়াবহ গুনা থেকে বেঁচে থাকার তৌফিক দান করুন আমিন।
*গীবতের মাধ্যম
গীবত এর মাধ্যম বলতে সাধারণত আমরা বুঝি, যার মধ্য দিয়ে বা যা ব্যবহার করে আমরা গীবত করি। সহজ ভাষায়, আমরা যেভাবে গীবত করে তাকে গীবতের মাধ্যম বোঝায় বিস্তারিত পড়লে ধারনাটা ক্লিয়ার হবে। আমরা সাধারণত চারটি মাধ্যমে গীবত করে থাকে
১। আল গীবত বিল লিশান (জিব্বা দিয়ে গীবত)
২। আল গীবত বিল কলব( অন্তর দিয়ে গীবত)
৩। আল গীবত বিল ইশারা (ইশার বা ইঙ্গিতের দ্বারা )
৪। আল গীবত বিল কিতাব (লেখনের মাধ্যমে গীবত )
সংক্ষেপে আমরা গীবত গুলো সম্পর্কে জেনে নেই। এক নাম্বার হল গীবত বিল লিসান বা জিব্বার দ্বারা গীবত। আমরা সাধারণত মানুষের ভুল ত্রুটির, দোষ, বদনাম, নিন্দা ইত্যাদি নিজের মুখে দ্বারা করে থাকি। মানুষের যে কোন প্রকারের দোষ যা তার মধ্যবিদ্যমান যেটা শুনলে সে মনে কষ্ট পাবে। যেমন ধরুন আপনি কোথাও কাজ করেন আপনার একজন সহকর্মি কাজে ফাঁকি দেয় আপনি আপনার কোন বন্ধুর নিকট বললেন যে অমুক ব্যক্তি কাজে ফাঁকি দেয়, এই ধরনের বলা । এটাকে গীবত বিল লিসান বা জিব্বার দ্বারা গীবত বলে ।
গীবত বিল কলব হল, অনুমান করা, আর অনুমান করা বড়গুনাহ। আপনি মনে মনে কারো ব্যাপারে খারাপ ধারণা করলেন যে অমুক ব্যক্তি সে হয়তো আমাকে দেখতে পারে না, সে শুধু নিজেকে বড় ভাবে, সে নিজেকে সবার থেকে আলাদা স্ট্যান্ডার মনে করে, সে অন্য কাউকে দাম দেয় না, ইত্যাদি নানা ধরনের খারাপ ধারণা আপনি মনে মনে পোষণ করলেন অন্যের ব্যাপারে, এটাকেই বলা হয় গীবত বিল কলব। আমরা এসব ধারণা থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করব ইনশাল্লাহ।
গীবত বিল ইশারা। এটা হল ইশারা ইঙ্গিতে কাউকে ছোট করা যেমন ধরেন তিনজন লোক এক জায়গায় একসাথে উপস্থিত। একজন আরেকজনকে ইঙ্গিত করে বলল ওই যে ওই কথাটা, অন্য ব্যক্তি মাথা নাড়িয়ে বলল হুমম বুঝেছি, তারা দুইজন বুঝল, অন্যজন বুঝলো না, দুজনেই অন্য আরেক জনের দোষ বা বদনাম করলো, এই ধরনের গীবতকে গীবত বিল ইসারা বলা হয় আমরা এ ধরনের ইশার গীবত থেকে নিজেকে হেফাজত করবা অন্যকে বিরত রাখার চেষ্টা করব আল্লাহ তৌফিক দান করুন আমিন।
গীবত বিল কিতাব, এটা হচ্ছে লেখনের মাধ্যমে, কোন বই পুস্তকের মাধ্যমে লিখিতভাবে, পেপার পত্রিকায় লিখিতভাবে, অন্যের দোষ বলা। আর বর্তমান সমাজে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ লিখিতভাবে গীবত করার মাধ্যমে হচ্ছে facebook। ধরেন আপনি কোন একটা লোকের বিরুদ্ধে একটা দোষ ফেসবুকে লিখলেন কিন্তু বাস্তবে তার কোন দোষই নেই এদিকে যার দোষ রটাল তার মান-সম্মান একদম ভুলন্ঠিত হয়ে গেল। এই ধরনের লিখিতভাবে যে গীবত রচনা করা হয় তাকে গীবত বিল কিতাব বলে।
*গীবতের ধরন
সাধারণভাবে আমরা বুঝি গীবতের ধরন বলতে যে যে বিষয় নিয়ে গীবত করা হয়। মানুষ সাধারণত ৫ ধরনের গীবত করে থাকে যেগুলো আমরা ক্রমান্বয়ে আলোচনা করব।
১। শারীরিক গীবত।
২। চারিত্রিক গীবত।
৩। বংশ মর্যাদার বা প্রভাব সংক্রান্ত গীবত।
৪।পোশাক পরিচ্ছদের গীবত।
৫। পরোক্ষ গীবত।
আসুন গীবত এর ধরন সম্পর্কে সংক্ষিপ্তভাবে জেনে নেই।
** শারীরিক গীবত আমরা করে থাকি randomly। যেমন ধরেন একজন মানুষ বয়স অনেক বেশি কিন্তু তার দাড়ি গোঁফ হয়নি। তাকে দেখতে অনেকটা অল্প বয়সী শিশুর মত মনে হয়, আবার অনেকেই অল্প বয়সে অনেক বৃদ্ধের মত মনে হয়, কেউ কেউ আছে মাথায় চুল নেই, অনেক খাটো অনেক মোটা, ভুরি বড়, ইত্যাদি দৈহিক সংক্রান্ত নানা সমস্যা নিয়ে অন্য কারো সঙ্গে কথাভালো আলোচনা করা। আমরা সর্বদাই নিজের অজান্তেই করে থাকি, এটা বিশেষ করে বন্ধুবান্ধব মহলে ফাজলামো করে করে হর হামসে করে থাকি। অনেক বড় গুনার কাজ এটা, আমাদেরকে এসব ব্যাপারে সতর্ক থাকা উচিত।
২। অন্যের চরিত্রের দোষ নিয়ে আমরা যে ধরনের নিন্দা করি এই ধরনের গীবত এ মানুষ বেশির ভাগ লিপ্ত থাকে।
৩। মানুষের বংশ মর্যাদা বা গুষ্টিগত অহংকার ইত্যাদি নিয়ে নিয়ে গীবত করা।
৪। পোশাক পরিচ্ছদের গীবত, ধরুন একটা বিয়ের অনুষ্ঠানে একজন মধ্যমা পারিবারিক অবস্থার লোকের দাওয়াত দিলেন। সে তার সাধ্যমত পোশাক পরিধান করে উপস্থিত হল যা আপনার ওই স্ট্যাটাসের চেয়ে কম মানের। এখানে মানুষের সমালোচনা এ ধরনের গীবত।
৫। পরোক্ষভাবে এটা হচ্ছে, কোন ব্যক্তির নামে সরাসরি না বলে এমনিতে ইশার বলে বেড়ানো, ওই যে চিনি চিনি, এই ধরনের কাজ কারবার করে।
আমরা পাঁচ ধরনের গীবত করে থাকি করে থাকি আল্লাহতালা আমাদেরকে এই সকল কর্ম থেকে হেফাজত করুন আমিন, ওমা তৌফিক ইল্লাল্লাহ।